আপনার কি এমন কোনো ব্যক্তির কথা মনে পড়ে, যিনি কোনো বিষয়ে সামান্য কিছু পারে কিন্তু মনে করেন যে তিনি সেই ক্ষেত্রে একজন পেশাদার? অথবা, অন্য দিকে, আপনি কি এমন কোনো খুব প্রতিভাবান ব্যক্তিকে চেনেন না, যিনি সর্বদা তার নিজের দক্ষতা নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন?
যদি এমন কিছু চোখে পড়ে, তাহলে বুঝবে তুমি মানব মনের এক দারুণ মজার খেলা দেখছো—এর নাম *ডানিং-ক্রুগার প্রভাব (Dunning-Kruger Effect)*। 🤯
ব্যাপারটা খুবই সহজ, কিন্তু অদ্ভুত । কম জ্ঞানীরা: এরা নিজেদেরকে চরম স্মার্ট ভাবে! এদের আসল সমস্যা হলো, নিজেদের অক্ষমতা মাপার মতো জ্ঞানটুকুই এদের নেই—তাই তারা ভুল করে নিজেদেরকে সুপারহিরো মনে করে, আর হয়ে ওঠে আত্মতুষ্ট। আবার, সত্যিই যারা বুদ্ধিমান, এরা উল্টো নিজেদের অবমূল্যায়ন করে বসে! ভাবে, "এটা তো খুবই সাধারণ বিষয়, এটা তো সবাই জানে।" তাদের কাছে নিজেদের প্রতিভাটা এতটাই স্বাভাবিক মনে হয় যে, তারা এর মূল্যটাই বুঝতে পারে না।
এক কথায়, জ্ঞানের জগতে এটা একটা চরম উল্টো খেলা! চলো দেখি, কেন আমাদের মাথা এমন গোলমাল পাকায়! 🤔

১। ডানিং-ক্রুগার প্রভাব আসলে কী?
ডানিং-ক্রুগার প্রভাব হলো এক প্রকার জ্ঞানীয় পক্ষপাত (Cognitive Bias) যা আমাদের নিজস্ব দক্ষতা এবং বুদ্ধিমত্তাকে বিকৃত করে।
ক. নামের পেছনের গল্প
এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৯৯ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সমাজ মনোবিজ্ঞানী ডেভিড ডানিং (David Dunning) এবং জাস্টিন ক্রুগার (Justin Kruger) দ্বারা।
উৎপত্তির কাহিনি: এই গবেষণাটি মূলত একটি অদ্ভুত বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল। একজন ব্যক্তি তার মুখে লেবুর রস মেখে ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা করেছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে রস তাকে নিরাপত্তা ক্যামেরার কাছে অদৃশ্য করে তুলবে! তিনি এতটাই অদক্ষ ছিলেন যে নিজের এই অক্ষমতাকে স্বীকার করতেও সক্ষম ছিলেন না।
খ. মূল ধারণা
সহজ কথায়, এই প্রভাবটি দুটি ধারণার মধ্যে নিহিত:
১. অজ্ঞানতা আত্মবিশ্বাস জন্ম দেয় (Ignorance Breeds Confidence): কোনো বিষয়ে সীমিত জ্ঞান থাকলে, ব্যক্তি সেই সীমিত জ্ঞানকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেখে এবং বিশ্বাস করে যে সে অত্যন্ত দক্ষ।২. জ্ঞানের অভিশাপ (The Curse of Knowledge): এটি একটি সুপরিচিত ঘটনা যে যখন কেউ কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে, তখন তারা মনে করতে থাকে যে অন্য সবাইও তা জানে। এর ফলে তারা তাদের নিজস্ব দক্ষতাকে কম মূল্যায়ন করে বা আত্ম-সন্দেহে ভোগে।
২। ঠিক কোন কারণে এমনটা ঘটে?
অদক্ষ বা কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা কেন তাদের ত্রুটিগুলি উপলব্ধি করতে পারে না? এর কারণ হলো এক ধরনের দ্বৈত বোঝা (Dual Burden)
১. প্রথম বোঝা (দক্ষতার অভাব): কোনো কিছু সঠিকভাবে করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা জ্ঞান তাদের থাকে না।
২. দ্বিতীয় বোঝা (মেটাকগনিশনের অভাব): সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাদের নিজেদের দক্ষতার অভাব পরিমাপ করার জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ার (অর্থাৎ, মেটাকগনিশন বা আত্ম-জ্ঞান) থাকে না।
কাউকে সেই বিষয়ে পারদর্শী হতে হলে সেই দক্ষতার মান কী তা জানতে হবে। কিন্তু অদক্ষরা এই মানগুলি জানে না। ফলস্বরূপ, তারা বুঝতে পারে না কোথায় তাদের ভুল হচ্ছে।
৩। ডানিং-ক্রুগার প্রভাব বনাম আপনার জীবন
এটি শুধুমাত্র শিক্ষাগত আলোচনার একটি মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে।
ক. কর্মক্ষেত্রে:
তর্কপ্রিয় মিটিং: প্রায়শই দেখা যায়, কোনো প্রকল্প সম্পর্কে যাদের জ্ঞান সবচেয়ে কম, তারাই মিটিংয়ে সবচেয়ে জোরে এবং আক্রমণাত্মকভাবে কথা বলে।
নেতৃত্বের সমস্যা: অনভিজ্ঞ পরিচালকরা তাদের অকার্যকর সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতার জন্য অন্য পরিচালকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে থাকেন, কারণ তারা নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করতে পারেন না।
খ. সোশ্যাল মিডিয়াতে:
বিশেষজ্ঞ জনতা: অনলাইনে তথ্য দ্রুত অ্যাক্সেস করার সুবিধার কারণে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ব্যক্তি একটি পোস্ট পড়েই মনে করে যে তারা সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে এবং তাই দৃঢ়ভাবে তাদের মতামত দেয়।
ভুল তথ্য ছড়ানো: যে ব্যক্তিরা আসলে বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না, তারা দ্রুত ভুল তথ্য চিন্তা করে এবং পাস করে দেন, কারণ তাদের কাছে তথ্যের সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা বা সুযোগ থাকে না।
গ. শিক্ষাক্ষেত্রে:
পরীক্ষার প্রস্তুতি: যারা ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয় না, তারা সবসময় পরীক্ষায় ভালো করার বিষয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী থাকে, শুধুমাত্র খারাপ নম্বর পাওয়ার জন্য।
৪। জ্ঞান শিখর এবং উপত্যকা: ডানিং-ক্রুগার গ্রাফের রেখাঙ্কন
ডানিং-ক্রুগার প্রভাব একটি গ্রাফের আকারে পুরোপুরি বোঝা যায়:
ক. বোকামির পর্বত (Mount Stupid)
অবস্থা: সামান্য কিছু জ্ঞান অর্জনের ঠিক পরের সময়কাল।
বৈশিষ্ট্য: আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। ব্যক্তি মনে করে যে সে সব জানে। এটি চরম আত্মবিশ্বাসের উচ্চতা।
খ. হতাশার উপত্যকা (Valley of Despair)
অবস্থা: যখন ব্যক্তি আরও বেশি জানতে পারে, যখন সে বিষয়টির বিস্তৃতি বুঝতে পারে।
লক্ষণ: ব্যাপক হতাশা এবং আত্মবিশ্বাস হারানোর অনুভূতি হয়। ব্যক্তি জানতে পারে যে সে সামান্যই জানে। এদের মধ্যে অনেকেই এই পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
গ. জ্ঞান লাভ করার জন্য ঢাল(Slope For Enlightenment )
অবস্থা: হতাশা কাটিয়ে ওঠা এবং নিয়মিত অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
বৈশিষ্ট্য: আরও জ্ঞানের সাথে সাথে, আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে একটি আরও বাস্তবসম্মত স্তরে ফিরে আসে।
ঘ. স্থিতিশীলতার উচ্চভূমি (Plateau of Sustainability)
অবস্থা: দীর্ঘ সময় ধরে শেখা এবং দক্ষতা অর্জন।
বৈশিষ্ট্য: এখন ব্যক্তি একজন আসল পেশাদার। তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী এবং বাস্তবতার সাথে সংযোগ বজায় রাখে। তাদের সীমাবদ্ধতাগুলিও তাদের কাছে খুব স্পষ্ট।
৫।এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার উপায়
ডানিং-ক্রুগার প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো কঠিন, তবে এই প্রভাবটি সামলানোর জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে:
মূল্যায়ন সহ্য করুন: আপনার কাজ বা মতামত সম্পর্কে গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া (Constructive Feedback) চাইতে শিখুন এবং সেগুলিকে সরাসরি বিবেচনা করুন।
আজীবন শেখার মনোভাব: মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের কোনো শেষ নেই। নিজেকে একজন আজীবন শিক্ষার্থী হিসাবে বিবেচনা করুন।
'কেন?’ যেকোনো মতামত প্রকাশের আগে নিজেকে আয়নায় সামনে নিয়ে প্রশ্ন অরুন, " আমি ঠিক কতটা জানি এ বিষয়ে?" নাকি, আমি কি অন্য দৃষ্টিকোণগুলিকে বিশ্বাস করেছি?"
নীরবতা অনুশীলন করুন:কখনও কখনও কেবল শোনা প্রয়োজন। অন্য লোকেদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দিয়ে আপনি আপনার সীমাবদ্ধতাগুলি আরও সহজে জানতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করুন: আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং দক্ষ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলুন। তাদের অভিজ্ঞতা এবং কাজের গুণমান আপনার জন্য একটি ভালো রেফারেন্স পয়েন্ট হবে।
ডানিং-ক্রুগার প্রভাব আমাদের শেখায় যে কেবল জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং আমাদের জ্ঞানের আত্ম-সচেতনতা থাকতে হবে। যখন আমরা আমাদের জ্ঞানের সীমানাগুলিকে মেনে নিতে সক্ষম হই, কেবল তখনই আমরা শেখার জন্য প্রস্তুত হই। তাই পরের বার যখন আপনি কোনো কিছু সম্পর্কে খুব নিশ্চিত হবেন, তখন এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলুন: *"আমি কতটুকু জানি না, তা কি আমি জানি?"* এই প্রশ্নটিই আপনাকে হতাশার উপত্যকা পার করে সত্যিকারের জ্ঞানের পথে নিয়ে যাবে।
Mst Nafisa Yeasmin
intern,content writing department
Requin BD.
Comments (0)
Leave a Comment